টংক আন্দোলন

টংক আন্দোলন

টংক আন্দোলন (১৯৩৭–১৯৫০) ছিল তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার (বর্তমান নেত্রকোনা) সুসং দুর্গাপুর ও পাহাড়ি অঞ্চলের হাজং, গারো ও অন্যান্য কৃষকের টংক খাজনা প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। কমরেড মণি সিংহ ছিলেন এর প্রধান নেতা।

টংক প্রথা কী ছিল?

টংক প্রথায় কৃষককে প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান খাজনা দিতে হতো – ফসল হোক বা না হোক। জমিদারেরা জমি নিলামে তুলতেন, আর খাজনার পরিমাণ বছরের পর বছর বাড়তে বাড়তে স্বাভাবিক নগদ খাজনার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়। ফসল নষ্ট হলে কৃষকের ভাগ্যে জুটত ঋণ, উচ্ছেদ আর অনাহার।

আন্দোলনের বিস্তার

১৯৩৭ সালের নভেম্বরে কারামুক্তির পর হাজং ও গারো কৃষকেরা মণি সিংহকে নেতৃত্ব দিতে অনুরোধ করেন। কৃষকেরা টংক দিতে অস্বীকার করেন এবং ন্যায্য নগদ খাজনার দাবি তোলেন। কৃষক সভার মাধ্যমে আন্দোলনটি বাংলার বৃহত্তর কৃষক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়; ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনায় নিখিল ভারত কৃষক সভার সম্মেলন হয়, যার অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন মণি সিংহ।

১৯৪৬ সাল থেকে আন্দোলন নির্মম দমনের মুখে পড়ে এবং সশস্ত্র অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি বহেরাতলীতে সশস্ত্র পুলিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে শহীদ হন রাশিমণি হাজং – যাঁকে সবাই ‘হাজং মাতা’ নামে স্মরণ করে; সেখানে আজ তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। ১৯৪৭-এর পর পাকিস্তান সরকার নেতাদের বেআইনি ঘোষণা করে, মণি সিংহের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এবং বহু হাজং পরিবার সীমান্ত পেরিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

বিলুপ্তি ও স্মৃতি

অবশেষে ১৯৫০–৫১ সালে টংক প্রথা বিলুপ্ত হয়। দুর্গাপুরের টংক শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ও হাজং মাতা রাশিমণি স্মৃতিসৌধ আজও এই আন্দোলনের স্মৃতি বহন করছে। আন্দোলনের শেষ জীবিত নেত্রীদের একজন কুমুদিনী হাজং ২০২৪ সালে প্রয়াত হন।