কমরেড মণি সিংহ: জীবনী

কমরেড মণি সিংহ: জীবনী

জন্ম
২৮ জুলাই ১৯০১, কলকাতা
আদি নিবাস
সুসং দুর্গাপুর, নেত্রকোনা
মৃত্যু
৩১ ডিসেম্বর ১৯৯০
পরিচিতি
টংক আন্দোলন, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধ
দলীয় পদ
সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (১৯৭৩–১৯৯০)
জীবনসঙ্গী
কমরেড অনিমা সিংহ
সম্মাননা
স্বাধীনতা পদক ২০০৪ (মরণোত্তর)
আত্মজীবনী
জীবন সংগ্রাম

জন্ম ও শৈশব

কমরেড মণি সিংহ ১৯০১ সালের ২৮ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন (বাংলাপিডিয়ায় জন্মতারিখ ২৮ জুন ১৯০১ এবং জন্মস্থান সুসং-দুর্গাপুর উল্লেখ আছে)। বাবা কালীকুমার সিংহ নেত্রকোনার পূর্বধলার জমিদার পরিবারের সন্তান; মা সরলা দেবী সুসং দুর্গাপুরের জমিদার পরিবারের মেয়ে। আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর কিছুদিন ঢাকায় মামা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সুরেন সিংহের বাড়িতে কাটে; তারপর মায়ের সঙ্গে চলে আসেন সুসং দুর্গাপুরে। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মাধ্যমিক পড়াশোনার জন্য কলকাতায় যান।

জমিদার পরিবারে জন্ম হলেও তিনি আরাম-আয়েশের জীবন বেছে নেননি। নিজের পরিবারের হাতেই গরিব কৃষকের ওপর যে শোষণ চলত, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি হয়ে ওঠেন নিঃস্ব মানুষের আপনজন।

বিপ্লবী রাজনীতিতে প্রবেশ

স্কুলজীবনেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯১৪ সালে গোপন বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন। ১৯২১ সালের অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন এবং ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ব্যক্তিগত সশস্ত্র তৎপরতার সীমাবদ্ধতা বুঝে তিনি মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ গ্রহণ করেন এবং ১৯২৫ সালে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হন। এ সময় বিপ্লবী গোপেন চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়।

১৯২৮ সালে তিনি কলকাতার মেটিয়াবুরুজে কেশোরাম কটন মিলের শ্রমিকদের ১৩ দিনের ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন এবং শ্রমিকদের দাবি আদায় করেন। এর ফলে তিনি শাসকদের চক্ষুশূল হন এবং ১৯৩০ সালে গ্রেপ্তার হন। ১৯৩৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে ও পরে সুসং দুর্গাপুরে অন্তরীণ রাখা হয়।

টংক আন্দোলন

মুক্তির পর তিনি আবার কলকাতায় ফিরে শ্রমিক আন্দোলন শুরু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সুসং দুর্গাপুরের হাজং ও গারো কৃষকেরা তাঁকে অনুরোধ করেন জমিদারদের চাপিয়ে দেওয়া ‘টংক’ প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে। টংক প্রথায় জমির খাজনা টাকায় নয়, নির্দিষ্ট পরিমাণ ধানে দিতে হতো – ফসল হোক বা না হোক। এই আবেদন উপেক্ষা করতে না পেরে তিনি টংকবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন। এ জন্য নিজের মামাদের – সুসং দুর্গাপুরের জমিদারদের – বিরোধিতার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। ১৯৪১ সালে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন।

১৯৪৪ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভার নেতৃত্বে নির্বাচিত হন এবং ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনায় নিখিল ভারত কৃষক সভার সম্মেলনে অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৬ সাল থেকে টংক আন্দোলন সশস্ত্র কৃষক অভ্যুত্থানে রূপ নেয়; হাজং মাতা রাশিমণিসহ বহু কৃষক শহীদ হন। শেষ পর্যন্ত ১৯৫০-৫১ সালে টংক প্রথা বিলুপ্ত হয়।

পাকিস্তান আমল: দুই দশকের আত্মগোপন

দ্বিজাতিতত্ত্ব ও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা তিনি মেনে নেননি। ১৯৪৭-এর পর পূর্ববঙ্গে কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্ব নেন। পাকিস্তান সরকার তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এবং তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। প্রায় বিশ বছর তাঁকে আত্মগোপনে থাকতে হয়।

আত্মগোপনে থেকেই ১৯৫১ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে পার্টি নিষিদ্ধ হয়; ১৯৫৬ সালের গোপন সম্মেলনে তিনি আবার সম্পাদক এবং ১৯৬৮ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভক্তিতে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ নেন। ১৯৬৭ সালে অন্তরীণ হন; ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে মুক্তি পেলেও কিছুদিনের মধ্যে আবার গ্রেপ্তার হন।

মহান মুক্তিযুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল সাধারণ বন্দিরা রাজশাহী কারাগার ভেঙে তাঁকে মুক্ত করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন – ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠনে ভূমিকা রাখেন, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে কাজ করেন এবং মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মনোনীত হন।

স্বাধীন বাংলাদেশে

স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি গণতন্ত্র ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যান এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে অবদান রাখেন। ১৯৭৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে বাকশালে যোগ দেন; ১৯৭৬ সালে পার্টি পুনর্গঠন করেন; সামরিক শাসনামলে ১৯৭৭ সালে প্রায় ৭৬ বছর বয়সে আবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটের পক্ষে প্রচার চালান। ১৯৮০ সালের তৃতীয় কংগ্রেসে আবার সভাপতি নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু এই দায়িত্বে ছিলেন।

১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই কিংবদন্তি বিপ্লবী প্রয়াত হন। তাঁর জীবনসঙ্গী কমরেড অনিমা সিংহও ছিলেন একই সংগ্রামের সাথি; তাঁদের একমাত্র সন্তান ডা. দিবালোক সিংহ।

সম্মাননা ও স্মৃতি

২০০৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে সুসং দুর্গাপুরে টংক শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং ‘মণি মেলা’ শুরু হয়। তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবন সংগ্রাম’ (দুই খণ্ড) এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

পূর্ণ জীবনপঞ্জি দেখুন · টংক আন্দোলন সম্পর্কে পড়ুন · তথ্যসূত্র